ইস্কুলের ডায়েরি #৩

Biology ক্লাসের স্রিভাস্তভ স্যার সামনের দেয়ালে ব্ল্যাক বোর্ডে চক দিয়ে মালেরিয়া মশার জীবন চক্র আকছিলেন । ছবিতে প্রায়ে অরধেক বোর্ড ভরে গেছে। পুর আকার কাজ শেষ করে স্রিভাস্তব স্যার ছবির পাশে পাশে তির টেনে ব্যাখা লিখছেন । ছবি শেষ হতে দশ মিনিট লাগবে কম পক্ষে । ভাল আঁকতে পারবার বেশ গর্ব স্যারের । মাঝে মাঝে এক পা পিছিয়ে এসে নিজের কারিগরি নিজেই জাচিয়ে নিছেন আর দরকার মত সামান্য অদল বদল করে জথা সম্ভব নিখুত করছেন মশা Lifecycleএর নকশা । প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে বলেছিলেন, একটা ছবির দাম এক পাতা লেখার থেকে বেশি । পরিক্ষাতে ভাল নম্বর পেতে হলে Biology-র নক্সা আকা অভ্যাশ করতে হবে । আমার ডেস্কের উপর একটা গুলি করা চিরকুট এসে পরল। পাসের সারি থেকে শুভেন্দু ছুরেছে। খুলে দেখি একটা কথা গোটা অক্ষরে লেখা – PICNIC.
টিফিনের সময় জোর কদমে প্ল্যানিং শুরু হয় গেল আমাদের মধ্যে। কোথায় জায়য়া হবে – কেউ বলে দাইমন্ড হারবর ত কেউ বলে ব্যান্ডেল । খায়য়া কি হবে, কারা যাবে, কি করা হবে, খরচা কত পরবে কোন কিছুই বাদ পরল না। ঠিক হল আমরা জাব ফুলেশর । ট্রেন বাস দুই ভাবে পৌছনো জায়ে সেখানে । আমাদের ক্লাসে সব থেকে সিনিওর Sam Jacob আমাদের চেয়ে দুই বছরের বর। দুই বার ক্লাস রিপিট করে আমাদের সঙ্গে পরেছে। সে বলল সে নাকি ভাল মুরগির ঝোল রাধতে পারে । আমাদের উতসাহ আর বেরে গেল। সঞ্জয় দত্ত থাকে সাল্কিয়াতে। সে বলল স্কুলের পর তার বাড়ি থেকে আমারা দল বেধে জেতে পারি বিকেল ছয়টার ট্রেন ধরলে ফুলেশর পউছে জাব সারে সাতটা নাগাদ। সঞ্জয় দাস রেগুলার বাজার করে। “গোটা মুরগি পালক ছাড়ানো নিলে ১২০ টাকা কিলো আর জ্যান্ত কিনলে ১০০ টাকায় পাওয়া যাবে”। গুরু প্রসাদের অঙ্কের মাথা পরিশকার সে মুখে মুখে হিসাব করে বলল, “ক্লাসে ৪৮ জন ছাত্র, যদি সবাই যায় আমাদের কম পক্ষে ১২টা মুরগি লাগবে , প্রতি চার জনের জন্য ১টা মুরগি হিসাব করলে । দের কিলো ওজনের মুরগি হলে ১৮ কিলো মুরগি । পালক ছাড়ানো হলে ২১৬০ টাকা আর জ্যান্ত ১৮০০”। কাটা মুর্গিতে আপত্তি করলে Sam Jacob, “এই গরমে কাটা মুরগি খারাপ হয়ে যাবে – তরা জ্যান্ত নেবার প্ল্যান বানা”। “মাথা পিছু কত করে পরবে হিসাব লাগালাম । জাতায়তের খরচা ধরলে কম করে ১০০ টাকা । একটু কমাতে পারলে ভাল হত , এটা সবাইয়ের মত কিন্তু মুরগি ছাড়া পিকনিক ভাবা জায়ে না । সবাই confused, অনেকে অনেক রকম মত দিচ্ছে কিন্তু কোনটাই জুতসই ঠেকছে না । আলচনা তর্কে পরিনত হতে চলেছে এই সময় সুভেন্দু আমাদের সকলকে হাত তুলে থামিয়ে দিল । “আমার একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে – মুরগির চিন্তা করিস না”। আমরা সবাই ওকে চেপে ধরলাম, কি এই প্ল্যান একটু খলসা করে বল। কিন্তু শুভেন্দু আর কিছুতেই মুখ খুলল না।
ভাল কথা – আমরা বাকিরা মিলে পিকনিকের প্ল্যানিং এগুতে থাকলাম। কমিটির মুখ্য আমরা ৫-৬ জন, তার মধ্যে সঞ্জয় দত্তর কথা আগেই করেছি, সাথে শুভেন্দু , গুর প্রসাদ, রানা, Sam Jacob আর আমি। প্রথমে একটা ক্লাস লিস্ট নিয়ে তাতে জারা জারা জেতে চায়ে তাদের নামের পাশে টিক মেরে আমরা পিকনিক জাত্রিদের তালিকা পাকা করতে লাগলাম। রান্নাতে জোগান দেবার জঞ্জ্য ৩ জন হাথ তুলল। ফুলেশরে পিকনিক যেখানে হবে তার পাশেই নদী। সাতার কাটা যাবে আর তার সাথে ফুটবাল ক্রিকেটের সরংজাম নিয়ে জাওয়া হবে। দলের ৫-৬ যাবে আগের দিন বিকেলে – গিয়ে রাত অখানেই কাটাবে আর জাগা দখল করবে, বাকিরা যাবে পরের দিন বাস ভারা করে। মট মাট সব প্রস্তুতি বেশ ভাল এগচ্ছে, কিন্তু মুরগির বন্দোবস্ত কিছুই এগছে না। আমরা শুভেন্দু কে চাপ দিলাম – “কি ব্যাপার – মুরগির কি হল” ?
পর দিন শুভেন্দু ইস্কুলে এল এমনি দিনার থেকে অনেক পরিপাটি হয়। জুতয় পলিস, শার্ট ইস্তিরি করা, গলার টাই ঠিক কায়েদায় গিট মারা। অন্য দিন োর টাই পকেটে থেকে জায়ে বাশির ভাগ সময়। অনিন্দ কে বলল “আজ তকে লাগবে – আমার সাথে হেডমাস্টারের Brother Maurice এর কাছে জেতে হবে। অনিন্দ আমাদের ক্লাসের গুড বয়, শিখকেরা সবাই ওকে ভালব্বাসে। মরিসের ঘরে ঢুকতে হবে শুনে অনিন্দ চখ কপালে উঠল। স্বেচ্ছায় হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকতে চাওয়া আর বাঘের খাঁচায়ে প্রবেশ করায় বিশেষ তফাত নেই। “কেন মরিস কি আমাকে ডেকেছে” ? সে ভয় ভয় জিগ্যেস করল। “না ডাকেনি, আমারাই জাচ্ছি – একটা দরকার পরেছে, তকে ছাড়া কাজ টা হবে না।”
Brother Maurice গত ৫ বছর ধরে Don Bosco Senior ইস্কুলের হেডমাস্টার। আমাদের যখন থেকে ক্লাস ৫ তখন থেকে আমারা তাকেই হেডমাস্টার পেয়েছি। তিনি এসেছেন সুদুর Australia থেকে। ইস্কুলের প্রত্যেকজন – ছাত্র, শিক্ষক, পিয়ন, মালি – সকলেই তাকে প্রচন্ড স্রদ্ধা করে। দুরদান্ত লোক – তার ধৈর্য, মানবিকতা, বুদ্ধি, উদ্যম সবকিছুই প্রচুর মাত্রায় রয়েছে Brother Maurice এর মধ্যে। অসাধারণ নাটক অভিনয় এবং পরিচালনা করতে পারেন, দুর্ধর্ষ ফুটবল খেলেন, ফাটাফাটি বেহালা বাজান আবার তুখর Physics, ইংরিজি আর অঙ্ক পরাতে পারেন। সচরাচর বোর্ডের পরিক্ষার বছর গুলিতে ( ক্লাস ১০ / ১২) তিনি প্রতি সেকশানে একটা করে সাব্জেক্ট পরাবার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া পুরো ইস্কুল চালাবার দৈনন্দিন কাজের দায়িত্য তো আছেই। তার বয়স ৪০ এর ঘরে, সব সময় একি ধাচের পোশাক পরেন – খয়েরি বা কালচে রঙের প্যান্টের উপর সাদা শার্ট (হাতা গুটানো), তার সাথে কাল রঙের টাই। চখে কাল ফ্রেমের চশমা, ছোট করে কাটা ছুল ব্যাকব্রাশ করা, তাতে সামনের দিক থেকে কপালের উপর অল্প টাক পরতে শুরু করছে। ছাত্রদের অসম্ভব ভালবাসতেন, কিন্তু রেগে গেলে সাবধান – Maurice এর সাথে কেউ বেয়াদপি করে পার পেত না।
দুপুর বেলার টিফিন বিরতির প্রথমেই হেদ্মাস্টারের দরজার সামনে পউছে গেল শুভেন্দু আর অনিন্দ্য। দরজার পাশে দারিয়ে পিয়ন জর্জ – Brother Maurice এর দান হাথ। শুভেন্দু তাকে জিগ্যাস করল – ” Brother Maurice আছে” ? জর্জ নটিস বোর্ডে জাল মেরামত করছিল, মাথা নেরে সায় দিল। “ভেতরে যাব” ? প্রশ্ন করল অনিন্দ্য। “হা – জাইয়ে, আভি আউর কই নেই হায়।” জর্জ উত্তর দিল কাজ করতে করতে। ঘরের ভেতরটা বেশ অন্ধকার। দিনের বেলাতেও কাঠের বর ডেস্কের উপর সবুজ শেড দেওয়া টেবিল ল্যাম্প জলছে। দেওয়াল জুরে বিভিন্ন আলমারি, তাতে ইস্কুলের জেতা নানা রকমের কাপ আর ট্রফি। জানলা গুলও বেশির ভাগ বন্ধ থাকে জাতে ঘরে ধুলো বেশি না ঢোকে। প্রকান্ড ডেস্ক উপরে মোটা কাচ পাতা। ডেস্ক ভরতি বেশ কিছু কাগজ পত্তর । মাঝে লেখার প্যাড তার পাশে স্ট্যান্ডে দুটো কলম। Brother Maurice প্যাডে কিছু একটা লিখছিলেন। শুভেন্দু দরজায় মাথা ঢুকিয়ে জিগ্যাস করল “Can we come in Brother” ? Maurice কাজ থেকে মাথা তুলে তাদের দেখে কলম বন্ধ করে বলল “Yes, come in.” চশমা একটু নেমে এসেছিল, সেটা নাকের উপর ঠেলে তিনি দুই মুরতিমান কে প্রস্নের চোখে দেখলেন। মুখে তার আরে প্রশ্ন করতে হল না – কি চাই ?
শুভেন্দু ভয় লুকিয়ে বলল – “আমরা Biology Practical ক্লাসে মুরগি dissect করতে চাই”।
Maurice – “ভাল কথা – কর।”
শুভেন্দু এতে একটু সাহস পেল। “Brother, ল্যাবরাটারিতে মুরগি রাখে না, ওটা কিনে আনতে হবে”।
জল কন দিকে গরাচ্ছে Maurice বুঝতে পারল – “মুরগির dissection কখনও পরিক্ষাতে আসে না”।
শুভেন্দু বধহয় শকালে মাথায় ব্রাহ্মি তেল লাগিয়ে এসেছে। তার মাথার বুদ্ধি আজ অসাধারন ভাল খেলছে। ” Brother, আমি এইটাই ভাবছি। এতদিন আসে নি বলেই এই বছর মুরগি আস্তে পারে। গত ৪ বছর আরশোলা আর ব্যাঙ ২ বার করে এসে গেছে। যদি আমাদের কপালে মুরগি আসে তাহলে আমাদের কোন প্রস্তুতি থাকবে না”।
Maurice গম্ভীর হয় ব্যাপারটা চিন্তা করল। তারপর অনিন্দ্য কে লক্ষ্য করে পরের প্রস্ন – “কটা মুরগি লাগবে তমাদের”?
অনিন্দ্য এতখন চুপ করে ছিল। হঠাত Maurice এর প্রশ্ন োর দিকে লক্ষ্য করাতে বেশ nervous হয় পরল। ঢোক গিলে বলে বসল “৪ জনের একটা মুরগি ধরলে ১২টা মুরগি লাগবে”।
Maurice ভুরু কুচকে – “৪ জনের একটা মুরগি মানে”?
শুভেন্দু ম্যানেজ দিল – “ও বলছে ৪ জন ছাত্র মিলে যদি গ্রুপ করে একটা মুরগি কাটে”।
Maurice চেয়ারে একটু এগিয়ে বসল, ডেস্কের অপর দিকে ছেলে দুটোর চখ থেকে তার দৃষ্টি নরছে না। “কোথায় করবে এই dissection? Biology laboratory তে”?
শুভেন্দু মাথা নারল – “ইস্কুলের laboratory তে হবে না – বাইরে করব – যদি আপনি অনুমতি দেন”।
” ইস্কুলের বাইরে গিয়ে করতে চাও – hmmm”, Maurice একটু ক্ষণ কিছু জেন চিন্তা করলেন। চস্মার কাচের পিছনে তার চোখে কি অল্প হাসির ঝলক দেখল দুই বন্ধু। তার পরে মুহূর্তেই আবার গম্ভীর – “কোন টিচার যাচ্ছেন তমাদের সাথে”?
“আমারা Biology স্যার স্রিভাস্তব কে বলে রেখেছি – এখন আপনি যদি একটু পারমিশন দ্যান”। শুভেন্দু বুঝতে পারছে যে তারা মঞ্জিলের খুব নিকটে পৌঁছে এসেছে। এবার খুব সাবধানে তরি তিরে ঠেকাতে হবে।
“তোমরা এটা নিয়ে বেশ গভীর পরিকল্পনা করেছ দেখছি – ঠিক আছে, আমি অনুমতি দিচ্ছি। Office থেকে একটা দরখাস্তের ফর্ম চেয়ে নাও। তাতে তমাদের জা লাগবে লিখে আমার থেকে সই করিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর যেটা খরচা হবে সেটা অফফিস থেকে রসিদ দেখিয়ে নিয়ে নিও”। Maurice দুই ছাত্রের দিকে অল্প হেসে আবার নিজের কাজের দিকে মন দিলেন।
শুভেন্দু আর অনিন্দ্য দুই জনেই বেশ কয়েকবার “Thank You Brother” বলতে বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
এই ডায়েরির বাকিটা সংক্ষেপে রাখছি।
পিকনিকের আগের দিন সঞ্জয় দত্তের বারিতে তার মা আমাদের খুব আদর করে লুচি দিয়ে মাংশের ঝোল খাওয়াল।
সঞ্জয় দাস বাজার থেকে একটা জালা ভরে ১২টা মুরগি কিনে আমাদের সাথে হাওড়া স্টেশনে দেখা করল।
ফুলেশর স্টেশনে বাতির চার পাশ ঘিরে এত পোকা আমি আরে কখন দেখিনি।
সারা রাত কাটল পিকনিক স্থানে মজুরদের সাময়িক ছাউনির ভিতর। মশার কামরে কারো এক ফোটা ঘুম হল না।
মুরগির ঝোল রাধবার আর খাবার সময় বেশ কয়েকবার Three cheers for Brother Maurice ডাক উঠেছিল যদিয়ও আমাদের সঙ্গে তিনি ছিলেন না। Sam Jacob বাকি দের বছর ইস্কুল জীবন এই রান্নার জোরে উত্রিয়ে নিয়েছিল।
নদির কাদায় খালি পায়ে ঘুরে আর সাতার কেটে আমার এক মাস পরে পেটে Ringworm ধরা পরল।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s